পশ্চিমবঙ্গের নাম বদলে ‘বাংলা’ বা ‘পশ্চিমবঙ্গ’ থেকে অন্য কোনও নামে করা হচ্ছে—এমন আলোচনা নতুন নয়। কিন্তু ২০২৬ সালে বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। বিশেষ করে কেরলের নাম ‘কেরলম’ করার প্রস্তাবে কেন্দ্রের অনুমোদনের পর পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তনের পুরনো দাবিটি নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনায় এসেছে।
পশ্চিমবঙ্গের নাম কি সত্যিই বদলে যাচ্ছে?
সংক্ষেপে উত্তর হলো—না, এখনও পশ্চিমবঙ্গের সরকারি নাম পরিবর্তন হয়নি। ২০২৬ সালের বর্তমান সরকারি তথ্যেও রাজ্যের নাম West Bengal / পশ্চিমবঙ্গ হিসেবেই রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটেও মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শুভেন্দু অধিকারীর নাম উল্লেখ রয়েছে।
অর্থাৎ, ‘পশ্চিমবঙ্গের নাম বদলে যাচ্ছে’ বলে যদি কোথাও এমনভাবে লেখা হয় যেন ইতিমধ্যেই সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে, সেটিকে সতর্কতার সঙ্গে দেখা দরকার।
তাহলে ‘বাংলা’ নামের প্রস্তাব এল কোথা থেকে?
২০১১ সালে তৎকালীন রাজ্য সরকার ‘Paschim Banga’ বা ‘পশ্চিমবঙ্গ’ নাম ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছিল। সেই প্রস্তাব কেন্দ্রের অনুমোদন পায়নি। এরপর ২০১৬ সালে রাজ্য সরকার তিন ভাষায় তিনটি নাম প্রস্তাব করে—
বাংলায় — Bangla
ইংরেজিতে — Bengal
হিন্দিতে — Bangal
কিন্তু সেই প্রস্তাবও কেন্দ্র গ্রহণ করেনি। এরপর ২০১৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা একক নাম হিসেবে ‘Bangla’ করার প্রস্তাব পাশ করে। সেটিও কেন্দ্রের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছিল।
কেন্দ্র কেন নাম পরিবর্তনের অনুমোদন দেয়নি?
এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বিষয় রয়েছে। কোনও রাজ্যের নাম পরিবর্তন শুধুমাত্র রাজ্য সরকার বা বিধানসভার সিদ্ধান্তে সম্পূর্ণ হয়ে যায় না। ভারতের সংবিধানের Article 3 অনুযায়ী রাজ্যের নাম পরিবর্তনের জন্য সংসদের মাধ্যমে আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়া প্রয়োজন।ভারতীয় সংবিধানের Article 3-এ রাজ্যের নাম পরিবর্তনসহ রাজ্যের সীমানা ও গঠন সংক্রান্ত বিষয়ে সংসদের ক্ষমতার কথা বলা হয়েছে। ২০২০ সালে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক রাজ্যসভায় জানিয়েছিল যে পশ্চিমবঙ্গের নাম ‘Bangla’ করার প্রস্তাব পাওয়া গিয়েছিল এবং একটি রাজ্যের নাম পরিবর্তনের জন্য সাংবিধানিক সংশোধনের প্রয়োজন হয়। তাই শুধু বিধানসভায় প্রস্তাব পাশ হলেই সরকারি নথিতে রাজ্যের নাম বদলে যায় না।
২০২৬ সালে আবার কেন বিষয়টি আলোচনায়?
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা কেরলের নাম ‘Keralam’ করার প্রস্তাবে অনুমোদন দেওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তনের পুরনো বিষয়টি আবার সামনে আসে। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশ্ন তোলেন—কেরলের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব অনুমোদন পেলে পশ্চিমবঙ্গের ‘Bangla’ নামের প্রস্তাব কেন এতদিন অনুমোদন পেল না। অর্থাৎ ২০২৬ সালে যে খবরটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে, সেটি আসলে পুরনো ‘Bangla’ নামের প্রস্তাবকে ঘিরে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক—নতুন করে পশ্চিমবঙ্গের নাম বদলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।
তাহলে ‘পশ্চিমবঙ্গ’ নামটি কি থাকবে?
বর্তমান তথ্য অনুযায়ী হ্যাঁ। এখনও রাজ্যের সরকারি নাম West Bengal বা পশ্চিমবঙ্গ। নাম পরিবর্তনের বিষয়ে নতুন কোনও কার্যকর সংসদীয় আইন না হওয়া পর্যন্ত সরকারি নাম পরিবর্তন হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যাবে না।
এখানে আরও একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—‘পশ্চিমবঙ্গ’ নামের জায়গায় ‘পশ্চিমবঙ্গ’ই থাকবে বলে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য এবং ‘রাজ্যের নাম পরিবর্তনের জন্য নতুন কোনও প্রস্তাব নেই’—এই ধরনের দাবির ক্ষেত্রে অবশ্যই নির্দিষ্ট সরকারি বিজ্ঞপ্তি বা বিধানসভার নথি দেখা উচিত।
‘পশ্চিমবঙ্গ’ নামের ইতিহাস এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
‘পশ্চিমবঙ্গ’ নামটি ভারতের দেশভাগের ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারতের বাংলা প্রদেশ ভাগ হওয়ার পর পশ্চিম অংশটি ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়ে West Bengal নামে একটি রাজ্য হিসেবে গঠিত হয়। অন্যদিকে পূর্ব বাংলা পরবর্তীতে পাকিস্তানের অংশ হয় এবং ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের সৃষ্টি হয়। তাই ‘West Bengal’ নামটি শুধুমাত্র একটি প্রশাসনিক নাম নয়—এর সঙ্গে দেশভাগ, বাংলা প্রদেশের ইতিহাস এবং স্বাধীনতার সময়কার রাজনৈতিক ঘটনাগুলোর সম্পর্ক রয়েছে। এই কারণেই নাম পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বিতর্কও তৈরি হয়।
‘পশ্চিমবঙ্গ’ থেকে ‘বাংলা’ হলে কী কী পরিবর্তন হতে পারে?
যদি ভবিষ্যতে কখনও কেন্দ্র ও সংসদের মাধ্যমে নাম পরিবর্তন করে Bangla করা হয়, তাহলে শুধু রাজ্যের নামের একটি শব্দ বদলাবে না। সরকারি নথি, কেন্দ্রীয় সরকারি রেকর্ড, বিভিন্ন প্রশাসনিক database, maps, সরকারি ওয়েবসাইট, পরিচয়পত্র ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নথিতে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনতে হবে। তবে এর অর্থ এই নয় যে সাধারণ মানুষের সমস্ত documents একদিনে বাতিল হয়ে যাবে। সরকার সাধারণত প্রয়োজন অনুযায়ী transition period এবং প্রশাসনিক নির্দেশিকা দেয়।
‘পশ্চিমবঙ্গ’ নাম বদলে ‘পশ্চিমবঙ্গ’ নয়, ‘পশ্চিমবঙ্গ আবাস’—এটা কী?
এখানে আরেকটি বিষয় নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।২০২৬ সালে রাজ্যের একটি আবাসন প্রকল্পের নাম ‘বাংলার বাড়ি’ থেকে ‘পশ্চিমবঙ্গ আবাস’ করা হয়েছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে। এটি রাজ্যের নাম পরিবর্তন নয়; এটি একটি সরকারি প্রকল্পের নাম পরিবর্তন।
অর্থাৎ— West Bengal → Paschim Banga
এমন কোনও সরকারি নাম পরিবর্তন হয়নি।
কিন্তু— Banglar Bari → Paschim Banga Awas
এটি একটি প্রকল্পের নাম পরিবর্তনের ঘটনা। দুটিকে এক করে ফেললে পাঠকদের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে।
২০২৬ সালে শুভেন্দু অধিকারী সরকারের নামকরণ নিয়ে কী হচ্ছে?
এখানে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন রাস্তা, এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানের নাম পরিবর্তনের বিষয় খতিয়ে দেখতে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের ঘোষণা করেছেন। এর মানে কিন্তু রাজ্যের নাম পরিবর্তন হচ্ছে না। অর্থাৎ বিভিন্ন রাস্তা বা এলাকার নাম পরিবর্তন এবং পুরো রাজ্যের নাম পরিবর্তন—দুটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।
তাহলে এখন আসল খবর কী?
সব তথ্য একসঙ্গে রাখলে বিষয়টি অনেকটা পরিষ্কার। বর্তমানে যা নিশ্চিত
১. পশ্চিমবঙ্গের সরকারি নাম এখনও West Bengal / পশ্চিমবঙ্গ।
২. ‘Bangla’ নাম করার একটি পুরনো প্রস্তাব ছিল।
৩. ২০১৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ‘Bangla’ নামের প্রস্তাব পাশ করেছিল।
৪. কেন্দ্র সেই প্রস্তাব অনুমোদন করেনি।
৫. ২০২৬ সালে কেরলের নাম ‘Keralam’ করার সিদ্ধান্তের পর ‘Bangla’ প্রস্তাবটি আবার রাজনৈতিক আলোচনায় এসেছে।
৬. কিন্তু এখনও পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তনের কোনও কার্যকর আইন হয়নি।
৭. বিভিন্ন রাস্তা, প্রকল্প বা প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তনকে রাজ্যের নাম পরিবর্তনের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা: সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন না
কেন্দ্রীয় সরকার কী বলেছে?
সংসদে কোনও Bill এসেছে কি?
রাষ্ট্রপতির সম্মতি হয়েছে কি?
সরকারি Gazette notification প্রকাশ হয়েছে কি?
এই চারটি বিষয় না দেখে শুধু সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্টের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।