ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ISRO) আবারও দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন অধ্যায় রচনার পথে। সংস্থার বর্তমান চেয়ারম্যান নারায়ণন ঘোষণা করেছেন যে, আগামী ২০২৬ সালের মার্চ মাসের মধ্যে ISRO সাতটি গুরুত্বপূর্ণ মহাকাশ মিশন উৎক্ষেপণের লক্ষ্য স্থির করেছে।
এই ঘোষণা ভারতের মহাকাশ অভিযানের ভবিষ্যৎকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে।
ভূমিকা: ভারতের মহাকাশ যাত্রার নতুন দিগন্ত
ভারত বরাবরই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। চন্দ্রযান, মঙ্গলযান, আদিত্য মিশন— প্রতিটি প্রকল্পই বিশ্বকে দেখিয়েছে ভারতের অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা।
এবার সেই ধারাবাহিকতায় ISRO আবারও মহাকাশ অভিযানে বড় পদক্ষেপ নিচ্ছে। ২০২৬ সালের মধ্যে সাতটি আলাদা মিশন উৎক্ষেপণ শুধু ভারতের নয়, বরং পুরো বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে।
ISRO’র আসন্ন সাতটি গুরুত্বপূর্ণ মিশন
1️⃣ চন্দ্রযান-৪ (Chandrayaan-4):
চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে আরও গভীর অনুসন্ধান করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে ভারতের চতুর্থ চন্দ্র মিশন। এটি চন্দ্রযান-৩ এর সাফল্যের উপর ভিত্তি করে তৈরি হবে। উদ্দেশ্য — চাঁদের অভ্যন্তরীণ গঠন ও পৃষ্ঠের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য বোঝা।
2️⃣ গগনযান (Gaganyaan Mission):
এটি ভারতের প্রথম মানববাহী মহাকাশ অভিযান। ভারতীয় মহাকাশচারীরা পৃথিবীর কক্ষপথে গিয়ে প্রায় ৩ দিন অবস্থান করবেন।
এই প্রকল্প সফল হলে ভারত হবে বিশ্বের চতুর্থ দেশ, যারা নিজস্ব প্রযুক্তিতে মানুষ পাঠাতে সক্ষম হয়েছে।
3️⃣ আদিত্য-L2 (Aditya-L2 Mission):
সূর্যের করোনা, সৌরঝড় এবং বিকিরণ অধ্যয়নের জন্য এটি ভারতের দ্বিতীয় সূর্য মিশন। Aditya-L1 এর সাফল্যের পর এটি আরও উন্নত প্রযুক্তিতে পরিচালিত হবে।
4️⃣ NISAR Mission (NASA-ISRO Synthetic Aperture Radar):
এটি NASA ও ISRO-র যৌথ উদ্যোগ। পৃথিবীর ভূমি পরিবর্তন, বনাঞ্চল ধ্বংস, ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগাম পূর্বাভাস দিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
5️⃣ কার্টোস্যাট-৩ সিরিজ (Cartosat-3 Series):
ভারতের নিজস্ব উচ্চ-রেজোলিউশন পর্যবেক্ষণ স্যাটেলাইট। এটি মানচিত্র নির্মাণ, নগর পরিকল্পনা, ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সাহায্য করবে।
6️⃣ Astrosat-2:
ভারতের দ্বিতীয় মহাকাশ টেলিস্কোপ, যা দূর নক্ষত্র, গ্যালাক্সি ও ব্ল্যাকহোল অধ্যয়নে ব্যবহৃত হবে। এটি ভারতের জ্যোতির্বিজ্ঞানে এক বড় পদক্ষেপ।
7️⃣ স্পেস ইন্টারনেট প্রকল্প:
ISRO নিজস্ব স্যাটেলাইট-ভিত্তিক ইন্টারনেট পরিষেবা চালু করতে যাচ্ছে, যাতে ভারতের প্রত্যন্ত এলাকাগুলিও দ্রুতগতির ইন্টারনেট সুবিধা পায়।
ISRO চেয়ারম্যান নারায়ণনের বক্তব্য
চেয়ারম্যান নারায়ণন এক প্রেস কনফারেন্সে জানান —
“আমাদের লক্ষ্য ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে সাতটি মিশন সম্পন্ন করা। ভারতের বিজ্ঞানীরা এই প্রকল্পগুলোয় দিনরাত পরিশ্রম করছেন। এই মিশনগুলো আমাদের মহাকাশ গবেষণাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।”
তিনি আরও যোগ করেন, এই সাতটি মিশনের প্রতিটি ভারতের প্রযুক্তিগত স্বাধীনতা ও বিশ্বমানের বৈজ্ঞানিক ক্ষমতার প্রতীক।
ভারতের মহাকাশ অভিযানের তাৎপর্য
ভারতের মহাকাশ অভিযানের গুরুত্ব এখন কেবল গবেষণাতেই সীমাবদ্ধ নয় — এটি দেশের অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা, এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদা-র সাথেও সরাসরি যুক্ত।
ISRO’র সাফল্যের প্রধান দিকগুলো —
- ভারত এখন বিশ্বের শীর্ষ ৫ মহাকাশ শক্তির মধ্যে।
- ভারতীয় প্রযুক্তি এখন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির সাথেও সমানভাবে কাজ করছে।
- ভবিষ্যতে ভারত বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণে আরও বড় বাজারে প্রবেশ করতে চলেছে।
- আত্মনির্ভর ভারতের স্বপ্ন পূরণের পথে ISRO এক অন্যতম স্তম্ভ।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
ISRO ভবিষ্যতে আরও কিছু উচ্চাভিলাষী প্রকল্প হাতে নিয়েছে —
- Reusable Launch Vehicle (RLV): পুনরায় ব্যবহারযোগ্য রকেট তৈরির কাজ চলছে।
- Deep Space Exploration: দূর মহাকাশ অনুসন্ধানের জন্য উন্নত যান তৈরি।
- Lunar Base Project: চাঁদের পৃষ্ঠে গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন।
উপসংহার
ISRO শুধু একটি গবেষণা সংস্থা নয়, এটি ভারতের বৈজ্ঞানিক আত্মবিশ্বাসের প্রতীক।
চন্দ্রযান থেকে শুরু করে গগনযান পর্যন্ত — প্রতিটি অভিযানই দেখিয়েছে, ভারত কেবল অনুসরণ করে না, বরং নেতৃত্ব দেয়।
২০২৬ সালের সাতটি নতুন মিশন ভারতের মহাকাশ ইতিহাসে আরেকটি গৌরবময় অধ্যায় যোগ করবে।