পশ্চিমবঙ্গে সরকারি নথি তৈরির ক্ষেত্রে নতুন উদ্যোগ। জলপাইগুড়ির মালবাজারে শুরু হল পাইলট প্রকল্প ‘প্রজেক্ট পরিচয়’ (Project Porichoy)। এই উদ্যোগের লক্ষ্য হল, সদ্যোজাত শিশুর জন্মের পর প্রয়োজনীয় সরকারি নথি তৈরির প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত ও সহজ করা। বিশেষ করে চা-বাগান অধ্যুষিত ও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের কথা মাথায় রেখে এই পরিষেবা চালু করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মালবাজার সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল থেকে এই প্রকল্প শুরু হয়েছে। সফল হলে ধাপে ধাপে মহকুমার অন্যান্য হাসপাতালেও পরিষেবাটি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
‘প্রজেক্ট পরিচয়’ আসলে কী?
কোনও শিশু মালবাজার সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে জন্মানোর পর তার পরিবারের জন্য জন্ম সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথি তৈরি করার পাশাপাশি আধার তৈরির প্রক্রিয়া এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে জাতিগত শংসাপত্রের প্রক্রিয়াকেও সমন্বিত করা হবে।আগে একটি শিশুর জন্মের পরে পরিবারের সদস্যদের আলাদা আলাদা সরকারি দপ্তর বা পরিষেবা কেন্দ্রে গিয়ে বিভিন্ন নথির জন্য আবেদন করতে হতে পারত। নতুন ব্যবস্থায় সেই প্রক্রিয়াকে হাসপাতালকেন্দ্রিক করে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।
কার জন্য এই পরিষেবা?
এটি বর্তমানে সদ্যোজাত শিশুদের জন্য পাইলট প্রকল্প।
বিশেষ করে— হাসপাতালে সদ্যোজাত শিশু , শিশুর জন্মের সরকারি নথি , শিশুর আধার তৈরির প্রক্রিয়া। যোগ্য তপশিলি জাতি (SC) ও তপশিলি উপজাতি (ST) পরিবারের শিশুর জাতিগত শংসাপত্র এই বিষয়গুলিকে একই প্রক্রিয়ার মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, এটি প্রত্যেক নাগরিকের আধার বা কাস্ট সার্টিফিকেট বাড়িতে গিয়ে বানিয়ে দেওয়ার সাধারণ পরিষেবা নয়।
কোথা থেকে শুরু হল?
বর্তমানে এই পাইলট প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক কাজ শুরু হয়েছে মালবাজার সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে। ৩ অক্টোবর ২০২৬ মালবাজার মহকুমা শাসকের কার্যালয়ের কনফারেন্স হলে প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। অনুষ্ঠানে জলপাইগুড়ির জেলাশাসক অদিতি চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। প্রশাসনের অন্যান্য আধিকারিকদের পাশাপাশি মালবাজার ও নাগরাকাটার বিধায়করাও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে মালবাজার হাসপাতালে পরিষেবাটি চালু করা হলেও ভবিষ্যতে সাফল্যের ভিত্তিতে মহকুমার অন্যান্য হাসপাতালেও এটি চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
জন্মের পর কোন কোন নথি পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ হবে?
‘প্রজেক্ট পরিচয়’-এর মূল লক্ষ্য হল শিশুর পরিচয় সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথি তৈরির প্রক্রিয়াকে একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া।
এর মধ্যে রয়েছে—
১. জন্ম শংসাপত্র , শিশুর জন্মের সরকারি রেকর্ড ও জন্ম শংসাপত্র তৈরির প্রক্রিয়া।
২. আধার , নবজাতকের আধার তৈরির প্রক্রিয়াকে হাসপাতালের পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ।
UIDAI-এর নিয়ম অনুযায়ী আধার তালিকাভুক্তির সময় শিশুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য পরিচয়/সম্পর্কের নথি এবং প্রয়োজনীয় তথ্য নেওয়া হয়; আধার তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়ায় ছবি ও প্রয়োজনীয় বায়োমেট্রিক তথ্যও UIDAI-এর নিয়ম অনুযায়ী সংগ্রহ করা হয়।
৩. জাতিগত শংসাপত্র, যোগ্য SC/ST শিশুর জাতিগত শংসাপত্র তৈরির প্রক্রিয়াও এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে বলে রিপোর্টে জানানো হয়েছে।
তাহলে কি আধার সত্যিই বাড়িতে পৌঁছে যাবে?
এখানেই সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনা রয়েছে। কিছু প্রতিবেদনের শিরোনামে বিষয়টিকে “বাড়িতে আধার ও কাস্ট সার্টিফিকেট পৌঁছে যাবে” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির মূল বিষয় হল হাসপাতালে শিশুর জন্মের পর নথি তৈরির বিভিন্ন প্রক্রিয়াকে সমন্বিত করা, যাতে পরিবারকে আলাদা আলাদা জায়গায় বারবার যেতে না হয় । অর্থাৎ এটাকে এখনই এমন কোনও রাজ্যব্যাপী পরিষেবা হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না যেখানে যে কোনও বয়সের মানুষ বাড়িতে বসে আধার বা কাস্ট সার্টিফিকেট পেয়ে যাবেন।
কারা মিলে কাজ করবে?
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই প্রকল্পে স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য দপ্তর এবং ভারতীয় ডাক বিভাগ সমন্বয় করে কাজ করবে। লক্ষ্য হল শিশুর জন্মের পর প্রয়োজনীয় সরকারি নথির প্রক্রিয়াকে দ্রুত সম্পন্ন করা এবং পরিবারের দৌড়ঝাঁপ কমানো। এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে এমন এলাকাগুলিতে যেখানে প্রত্যন্ত গ্রাম বা চা-বাগান থেকে সরকারি অফিসে বারবার যাতায়াত করা পরিবারের জন্য সময় ও খরচের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
কেন মালবাজারে এই পাইলট প্রকল্প?
মালবাজার মহকুমায় বহু চা-বাগান এলাকা ও প্রত্যন্ত অঞ্চল রয়েছে। ফলে কোনও শিশুর জন্মের পরে বিভিন্ন সরকারি নথির জন্য একাধিক জায়গায় যাতায়াত করা পরিবারের কাছে ঝামেলার হতে পারে। এই বাস্তব সমস্যাকে মাথায় রেখেই হাসপাতাল থেকে শুরু করে বিভিন্ন নথি তৈরির প্রক্রিয়াকে একসঙ্গে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
এরপর কী হতে পারে?
এখনও এটি পাইলট প্রকল্প। অর্থাৎ প্রথমে মালবাজার সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে এর কার্যকারিতা দেখা হবে। প্রকল্পটি সফল হলে প্রশাসনের পরিকল্পনা অনুযায়ী ধাপে ধাপে মালবাজার মহকুমার অন্যান্য হাসপাতালেও পরিষেবাটি সম্প্রসারণ করা হতে পারে। তাই ভবিষ্যতে এই ধরনের হাসপাতালভিত্তিক নথি পরিষেবা পশ্চিমবঙ্গের আরও জায়গায় দেখা যাবে কি না, সেটি প্রকল্পের ফলাফল ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা
‘প্রজেক্ট পরিচয়’ মানে এখনই গোটা পশ্চিমবঙ্গে সবার বাড়িতে আধার ও কাস্ট সার্টিফিকেট পৌঁছে যাবে—এমন নয়। এটি বর্তমানে মালবাজারে শুরু হওয়া একটি নবজাতক-কেন্দ্রিক পাইলট উদ্যোগ। হাসপাতাল থেকেই শিশুর জন্ম-সংক্রান্ত নথির সঙ্গে আধার এবং যোগ্য ক্ষেত্রে জাতিগত শংসাপত্র তৈরির প্রক্রিয়াকে সমন্বিত করাই এর মূল লক্ষ্য।




Leave a Comment