সেদিন আমি বাসে করে কোথাও যাচ্ছিলাম। বাসটা খুব একটা ভিড় ছিল না। জানালার পাশে বসে বাইরে তাকিয়ে ছিলাম। হঠাৎ একজন ছেলে এসে আমার পাশে বসলো। বয়স হয়তো কুড়ি থেকে ত্রিশের মধ্যে হবে। চেহারায় একটা অদ্ভুত শান্ত ভাব, কিন্তু চোখ দুটো দেখে মনে হচ্ছিল সেখানে অনেক না-বলা কথা জমে আছে। কিছুক্ষণ পর সে হালকা গলায় বলল,
— “ভাই, একটা কলম হবে?”
আমার কাছে একটা কলম ছিল। আমি কলমটা তার হাতে দিয়ে দিলাম। সে একটা কাগজে কিছু লিখল। তারপর কলমটা ফেরত দিতে দিতে হঠাৎ বলল,
— “জানো, একটা কলম দিয়েই আজ তোমার সঙ্গে আমার একটা গল্প শুরু হলো।”
আমি একটু অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম।
সে মৃদু হেসে বলল,
— “আমার জীবনের একটা গল্প বলব? শুনবে?”
আমি চুপ করে মাথা নাড়লাম।
সে জানালার বাইরে তাকিয়ে বলতে শুরু করল…
“উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পর আমি কলেজে ভর্তি হলাম। তখন জীবনটা অনেক সহজ মনে হতো। পড়াশোনা, বন্ধু আর ভবিষ্যৎ নিয়ে হাজারটা স্বপ্ন।সেই সময় একটা মেয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। প্রথমে শুধু কথা হতো। তারপর সেই কথাগুলো কখন যে প্রতিদিনের অভ্যাস হয়ে গেল, বুঝতেই পারিনি। ওর সঙ্গে কথা না বললে দিনটা কেমন অসম্পূর্ণ লাগত। ধীরে ধীরে আমরা দুজনেই বুঝলাম—আমরা একে অপরকে ভালোবেসে ফেলেছি। অনেকদিন আমাদের সম্পর্কটা খুব ভালোই চলেছিল। একদিন আমার বাড়িতে সবকিছু জানতে পারল। আশ্চর্যের বিষয়, আমার পরিবার আমাদের সম্পর্ক মেনে নিয়েছিল।কিন্তু ওর পরিবার রাজি হলো না।
তারা বলেছিল—
‘ছেলেটা মধ্যবিত্ত পরিবারের। দেখতে তেমন ভালো নয়। ভবিষ্যৎ কী, সেটাও নিশ্চিত নয়।’
আমাকে নানা কারণে প্রত্যাখ্যান করা হলো। কিন্তু ও আমাকে ছাড়তে চায়নি।
একদিন ও বলল,
— ‘চলো, আমরা বাড়ি ছেড়ে চলে যাই।’
আমি ওর কথা শুনে অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলাম। আমি ওকে ভালোবাসতাম। খুব ভালোবাসতাম।
তবুও বলেছিলাম,
— ‘আমাদের জন্য আমাদের বাবা-মা এত কষ্ট পাবে, সেটা কীভাবে মেনে নেব? শুধু ভালোবাসি বলেই কি এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়?’
ও চুপ করে গিয়েছিল।
তারপর আমাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি শুরু হলো। কথা কমতে কমতে একসময় আমরা আলাদা হয়ে গেলাম। আমি ভেবেছিলাম, হয়তো কিছুদিন পর সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু জীবন সবসময় আমাদের ইচ্ছেমতো গল্প লেখে না। অনেকদিন পর জানতে পারলাম, ওর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে। আমি কিছুই করতে পারিনি। ওর বিয়ে হয়ে গেল। তারপর অনেক বছর কেটে গেছে। ও হয়তো এখন নিজের সংসারে ভালো আছে। হয়তো আমাকে আর মনে রাখেও না।
কিন্তু জানো…
কিছু মানুষ জীবন থেকে চলে যায়, কিন্তু মনের ভেতর থেকে পুরোপুরি চলে যেতে পারে না। আমি আজও ওকে ভুলতে পারিনি।” এই পর্যন্ত বলে ছেলেটা চুপ করে গেল। বাস তখন একটা স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়েছে। সে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল। তার চোখে পানি ছিল কি না, আমি নিশ্চিত নই। তবে তার কণ্ঠে একটা ভারী নীরবতা ছিল।আমি জিজ্ঞেস করলাম, —
“তুমি আবার বিয়ে করোনি কেন?”
সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
— “জানি না। হয়তো সাহস হয়নি। হয়তো মনে হয়েছে, কাউকে জীবনে এনে তার প্রতি অন্যায় করতে চাই না। আবার এটাও জানি, যে মানুষটা আমার জীবনে নেই, তার জন্য সারাজীবন থেমে থাকাও কোনো সমাধান নয়।”
বাসটা আবার চলতে শুরু করল। সে আমার হাতে কলমটা ফিরিয়ে দিয়ে বলল,
— “কলমটা তোমার। কিন্তু আজ এটা আমাকে একটা পুরোনো কথা মনে করিয়ে দিল।”
আমি কলমটা হাতে নিলাম। বাসের জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখলাম, ছেলেটা ধীরে ধীরে দূরে চলে যাচ্ছে।
সেদিন আমি একটা জিনিস বুঝেছিলাম—
সব ভালোবাসার শেষ একসঙ্গে হওয়া নয়। কিছু ভালোবাসা শেষ হয়ে যায়, কিন্তু তার গল্পটা থেকে যায়। তবে জীবন থেমে থাকে না। কেউ আমাদের ছেড়ে চলে গেলে তার স্মৃতিকে সম্মান করা যায়, কিন্তু নিজের জীবনটাকেও আবার নতুন করে বাঁচতে হয়।
কারণ—
কিছু মানুষ আমাদের জীবনের শেষ অধ্যায় হয় না, তারা শুধু এমন একটা অধ্যায় হয়ে থাকে যেটা আমরা কোনোদিন পুরোপুরি ভুলতে পারেনি এখনও ।
Writer by — Abdul Aziz All Amman