এই বছরের শুরুতেই আকাশে দুটো খুব সুন্দর আর দর্শনীয় জিনিস ঘটতে চলেছে। প্রথমটা হলো ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর Ring of Fire Eclipse বা আগুনের রিং সূর্যগ্রহণ। এই গ্রহণে সূর্যের মাঝখানটা চাঁদ ঢেকে ফেলবে, কিন্তু চারপাশে একটা উজ্জ্বল আগুনের রিং দেখা যাবে। খুবই অসাধারণ দৃশ্য। তবে দুঃখের বিষয় যে ভারত থেকে এটা দেখা যাবে না। যারা দেখতে চান, তাদের দক্ষিণ আমেরিকা (আর্জেন্টিনা, চিলি), দক্ষিণ আফ্রিকা বা নামিবিয়ার দিকে যেতে হবে।
তারপর আসছে আরও একটা মজার ঘটনা – ৩ মার্চ ২০২৬-এর Total Lunar Eclipse বা সম্পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণ। এটাকে আমরা সাধারণত Blood Moon বলি। চাঁদ পুরোপুরি পৃথিবীর ছায়ায় চলে যাবে আর লালচে-কমলা রঙ ধারণ করবে। এটা ভারত থেকে খুব ভালোভাবে দেখা যাবে। রাত ১২টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত বিভিন্ন স্টেজ দেখা যাবে, আর সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তটা হবে রাত ৩:৩০-৪:১৫ নাগাদ। কোনো টেলিস্কোপ লাগবে না, শুধু ছাদে বা খোলা জায়গায় দাঁড়ালেই হবে। ফোন দিয়ে ছবিও তুলতে পারবে।
দুটোই খুব কম ঘটে এমন ঘটনা, আর একই বছরে দুটোই পাওয়া যাচ্ছে। তাই যারা আকাশ দেখতে ভালোবাসো, তাদের জন্য এটা একটা দারুণ সুযোগ। ক্যালেন্ডারে দুটো তারিখেই বড় করে দাগ দিয়ে রাখো। ১৭ ফেব্রুয়ারিতে যদি ট্রাভেল করার প্ল্যান থাকে তাহলে Ring of Fire দেখার চেষ্টা করো, আর ৩ মার্চ রাতে অবশ্যই অ্যালার্ম দিয়ে রাখো – Blood Moon মিস করা যাবে না।
আর হ্যাঁ – বন্ধুদেরও মনে করিয়ে দিও। আকাশের এই সৌন্দর্য সবাই মিলে উপভোগ করা উচিত। 🌑🔥🌕
গ্রহণের বিজ্ঞানটা খুব সুন্দর আর সোজা। আসলে এটা পুরোপুরি জ্যোতির্বিদ্যার (astronomy) ব্যাপার, কোনো অলৌকিক বা রহস্যময় ঘটনা নয়। দুটো প্রধান ধরনের গ্রহণ আছে যেগুলো নিয়ে আমরা কথা বলছি: সূর্যগ্রহণ (solar eclipse) আর চন্দ্রগ্রহণ (lunar eclipse)। চলো এক এক করে সহজ করে বোঝাই।
প্রথমে Ring of Fire Eclipse বা annular solar eclipse-এর কথা। এটা ঘটে যখন চাঁদ পৃথিবী আর সূর্যের মাঝখানে এসে দাঁড়ায়, কিন্তু চাঁদ তখন তার কক্ষপথে সবচেয়ে দূরের বিন্দুতে থাকে (apogee)। তাই চাঁদটা আকারে একটু ছোট দেখায় আর সূর্যকে পুরোপুরি ঢাকতে পারে না। ফলে সূর্যের চারপাশে একটা উজ্জ্বল আলোর রিং বা আংটি দেখা যায়। এই আংটিটাই “ring of fire” নাম পেয়েছে। মাঝখানটা কালো হয়ে যায়, কিন্তু চারদিকে আগুনের মতো আলো জ্বলতে থাকে। এটা শুধু তখনই হয় যখন চাঁদ আর সূর্যের আপাত আকার প্রায় একই রকম হয়, কিন্তু চাঁদটা একটু ছোট থাকে।
এবার Total Blood Moon Eclipse বা সম্পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের কথা। এটা ঘটে যখন পৃথিবী সূর্য আর চাঁদের মাঝখানে চলে আসে। অর্থাৎ সূর্যের আলো পৃথিবীর ছায়ায় চাঁদ পড়ে যায়। পুরো চাঁদ যখন পৃথিবীর ছায়ার গাঢ় অংশে (umbra) ঢুকে যায়, তখন সে একদম অন্ধকার হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু তা হয় না। কেন? কারণ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল সূর্যের আলোকে বাঁকিয়ে (refract) চাঁদের দিকে পাঠায়। এই আলো যাওয়ার পথে নীল আলো (short wavelength) বেশি ছড়িয়ে পড়ে (Rayleigh scattering), আর লাল আলো (long wavelength) বেশি পৌঁছায়। ফলে চাঁদ লালচে-কমলা বা তামাটে রঙ ধারণ করে। এই কারণেই আমরা বলি “Blood Moon”।
এই দুটো ঘটনার মধ্যে মূল পার্থক্য হলো:
- সূর্যগ্রহণে চাঁদ সূর্যকে ঢাকে (দিনের বেলা ঘটে, খালি চোখে দেখতে হলে বিশেষ ফিল্টার লাগে)।
- চন্দ্রগ্রহণে পৃথিবী চাঁদকে ছায়া দেয় (রাতের বেলা ঘটে, খালি চোখেই দেখা যায়)।
এই দুটোই তখনই হয় যখন সূর্য, পৃথিবী আর চাঁদ একটা সোজা বা প্রায় সোজা লাইনে চলে আসে। আর এটা শুধু নির্দিষ্ট তারিখে ঘটে কারণ চাঁদের কক্ষপথ পৃথিবীর কক্ষপথের সঙ্গে ৫° কোণে ঝুঁকে থাকে, তাই সব মাসে গ্রহণ হয় না।
তাই এই ফেব্রুয়ারি আর মার্চের গ্রহণ দুটো দেখার সুযোগ পেলে অবশ্যই দেখো। বিশেষ করে মার্চের Blood Moon-টা ভারত থেকে খুব সুন্দর দেখা যাবে। কোনো যন্ত্র লাগবে না, শুধু আকাশের দিকে তাকালেই হবে। আর হ্যাঁ, ছবি তুলতে চাইলে ফোনের ক্যামেরা + ট্রাইপড রাখো – খুব ভালো ছবি উঠবে।
আকাশের এই সৌন্দর্য সত্যিই অসাধারণ। মনে রাখো, এগুলো কোনো অলৌকিক ঘটনা নয় — শুধু সূর্য, পৃথিবী আর চাঁদের নিয়মিত নাচের একটা অংশ। 🌑🔥🌕